Sahittya

Literature magazine | Bangla & english worldwide

The path of love : Osho Rajneesh

The path of love : Osho Rajneesh

দি পাথ অব লাভ : ওশো রজনীশ : ৫

The path of love : Osho Rajneesh

প্রেমের সরল পথ (দি পাথ অব লাভ) : ওশো রজনীশ

অনুবাদ : শুভ্র চৌধুরী

 

কবিরের ধর্ম খুবই নান্দনিক, শৈল্পিক। তিনি ছিলেন একজন মহান কবি—যদিও অশিক্ষিত। কিন্তু কবি হওয়ার সাথে শিক্ষার কি সম্পর্ক? একজন মহান কবি, মহান কবিদের একজন; তার কবিত্বশক্তি উর্ধ্বলোকের, জাগতিক নয়। তিনি বলেন, কাউকে-না-কাউকে তো সৌন্দর্য্যের সন্ধানে থাকতে হবে। এটাই সব; সমগ্র প্রকৃতি সৌন্দর্য্যে ভরপুর। সৌন্দর্য্যের আড়ালে আছেন ঈশ্বর। সকল সৌন্দর্য্য তাঁর। যখন তুমি কোনো সুন্দর মানব চেহারা দেখতে পাও—একজন পুরুষ, একজন নারী—এটা আসলে ঈশ্বরের চেহারা। যখন তুমি দু’টি সুন্দর চোখের দিকে তাকাও, তুমি মূলত ঈশ্বরের মন্দিরে প্রবেশ করো। যখন তুমি একটি ফুল ফুটতে দেখো, এটি মূলত ঈশ্বরের পক্ষ থেকে একটি নিমন্ত্রণ।

প্রতিটি ফুল এক একটি নিমন্ত্রণ, ঈশ্বরের সাথে সাক্ষাতের। প্রতিটি পাখির গান এবং আকাশে পুঞ্জীভূত প্রতিটি মেঘমালা, বাণীর মতো কিছু একটা, একটা সংকলিত বাণী। তোমাকে এর মর্ম উদ্ধার করতে হবে, তোমাকে এর গভীরে যেতে হবে, যদি তুমি সে বাণী শুনতে চাও—তোমাকে নীরব হতে হবে।

এ জন্য চোখ বোজার দরকার নাই। চোখ বোজা থাকুক কিংবা খোলা—তুমি তাকে দেখো, কারণ তিনি তোমার ভেতরে ও বাইরে সর্বত্র।
সকল অসঙ্গতি মিলিয়ে যাবে, যদি তুমি ঈশ্বরকে পাও, এর আগে কখনো নয়—কারণ মন অসঙ্গতি তৈরি করে। যখন তুমি ঈশ্বরকে পাবে, মন কিছু করতে পারবে না, আর মনের সাথে চলা মানে অসঙ্গতি। তখন দিবা-রাত্রি এক মনে হবে। আর জীবন ও মৃত্যুও—এক মনে হবে। তখন তোমার অস্তিত্ব থাকা-না-থাকায় কোনো পার্থক্য সৃষ্টি হবে না। তখন নিঃশ্বাস এবং প্রশ্বাসকে আলাদা মনে হবে না, বরং দুটিকে মনে হবে একই প্রক্রিয়া।

আমি যেখানে যাই না কেন,
তাকে ঘিরেই আমার আবর্তন।
যা কিছু আমার অর্জন
সবই তাঁর সেবায় নিবেদিত :
যখন আমি শুয়ে পড়ি,
তখন আমি তার পায়ে অবনত।
তিনিই আমার একমাত্র আরাধ্য :
আমার আর অন্য কেউ নেই।
আমার জবান বেহুদা বাক্যালাপ থেকে মুক্ত,
দিবস-রজনী সে শুধু তার মহিমা কীর্তন করে :
বসা কিংবা দাঁড়ানো
কোনো অবস্থায়ই আমি তাকে ভুলতে পারি না;
তাঁর সঙ্গীত বাজতে থাকে আমার কানে।
আমার হৃদয় উদ্বেলিত,
আর আমি গোপনীয়তাকে উন্মুক্ত করি
আমার হৃদয়ের কাছে।
আমি এই স্বর্গীয় আনন্দের মাঝে ডুবে থাকি
যা আনন্দ-বেদনার সকল সীমাকে ছাড়িয়ে যায়।

মনে রেখ, অসঙ্গতি আমাদের তৈরি—কারণ আমরা পুরোটা দেখতে পাই না, আমরা আংশিক দেখতে পারি। সে কারণেই আমাদের কাছে অসঙ্গত মনে হয়। তুমি পর্যবেক্ষণ করে দেখ। এমনকি যদি তুমি একটি নুড়ি পাথরকে হাতের তালুতে নিয়ে দেখ, তুমি এক সময়ে এর পুরোটা দেখতে পারবে না। তুমি একটা অংশ দেখ, অন্য অংশটি আড়ালে। যখন তুমি অন্য অংশটি দেখ, তখন প্রথম অংশটি আড়ালে চলে যায়। তুমি কখনো একটা ছোট্ট নুড়ি পাথরের পুরোটা একসাথে দেখতে সক্ষম নও; এমনকি একটি বালুকণাও না। যখন তুমি আমার চেহারা দেখ, তখন আমার পেছনটা তোমাকে অনুমান করে নিতে হয় : হতে পারে সেটি সেখানে আছে, অথবা নেই। যখন তুমি আমার পেছনটা দেখ, তখন আমার চেহারাটা একটা অনুমান : এটি সেখানে থাকতে পারে, নাও থাকতে পারে। আমরা কখনো কোনো কিছুর পুরোটা দেখতে সক্ষম নই, কারণ মন কোনোকিছুর সমগ্রটা দেখতে পারে না। মন হচ্ছে একটা ভগ্ন দৃষ্টিভঙ্গি।

যখন মনকে ছুড়ে ফেলো এবং ধ্যানের উদয় হয়, তখন তুমি সমগ্রকে দেখতে পাও। তখন তুমি সমগ্রটা ঠিক যেমন তেমনই দেখ। তখন শীত-গ্রীস্ম শরৎ-বসন্ত আলাদা থাকে না। তখন তুমি দেখতে পাও, জন্ম ও মৃত্যু একই প্রক্রিয়ার দুইটি রূপ। তখন সুখ ও দুঃখ বিপরীত থাকে না, তারা এক হয়ে যায়; যেমন একটা সমতলভূমি ও পর্বত, একই সাথে যুক্ত।

যখন তুমি জীবনের একতা দেখতে পাও, তখন আর নিজস্ব কোনো পছন্দ থাকে না। তখন পছন্দ করার মতো আর কিছুই থাকে না। তুমি কি এটা দেখনি? যখন তুমি সুখ পছন্দ করো, দুঃখের শিকার হয়ে যাও; তুমি সাফল্য চাও, ব্যার্থতা চলে আসে; যখন আশা করো, হতাশা তোমার অপেক্ষায় থাকে। যখন তুমি জীবনের সাথে যুক্ত হও, মৃত্যু চলে আসে এবং সবকিছু শেষ করে দেয়।

প্রতি দিন, প্রতি মুহূর্তে তুমি কি এটা হতে দেখছো না? আসলে এরা বিপরীত কিছু নয়, এরা মূলত একই। যখন কেউ এদের একসাথে দেখে, তখন সেখানে চয়েজ করার কি থাকে? সেখানে পছন্দের কিছু নেই; একজন তখন চয়েজলেস হয়ে যায়।

কৃষ্ণমূর্তি এই কথাই বলেছেন : চয়েজলেস হও, পছন্দহীন সচেতনতার অবস্থায় থাকো, কিন্তু কখনো ঘটবে না যদি না তুমি সবকিছুর একত্ব দেখতে পাও। যখন অনুধাবন করবে, সবকিছুর মাঝে একটা একতা আছে, তখন পছন্দ অসম্ভব হয়ে যাবে। তখন সেখানে পছন্দ করার কিছু থাকে না, কারণ তুমি যা’ই পছন্দ করবে তা’ই এর বিপরীতকে সাথে নিয়ে আসবে। তাহলে মূল ব্যাপারটা কি? তুমি পছন্দ করো ভালোবাসা, আর ঘৃণা চলে আসে; তুমি পছন্দ করো বন্ধুত্ব, আর শত্রুতা চলে আসে; তুমি যা’ই পছন্দ করো, ছায়ার মতো এর বিপরীত চলে আসে। যে পছন্দ করা বন্ধ করে। যে পছন্দহীন থাকে। আর যখন কেউ পছন্দহীন হয়, তখন তার জন্য আর কোনো অসঙ্গতি থাকে না।অসঙ্গতি না-থাকা মানে মন না-থাকা, আর মন থাকলে ভালোবাসাকে জানা যায়। এখন পর্যন্ত তুমি ভালোবাসা সম্পর্কে যা জানো তার সাথে ভালোবাসার কোনো সম্পর্ক নেই। এটা আসলে ‘ভালোবাসা’ শব্দটির অপব্যবহার। সবচেয়ে বেশি অপব্যবহার হয়েছে ‘ভালোবাসা’ শব্দটির। ‘ঈশ্বর’ আর ‘শান্তি’ হচ্ছে এমন আরো দুটি শব্দ। কিন্তু ‘ভালোবাসা’ এক্ষেত্রে সবার উপরে। সবাই ভালোবাসার কথা বলে, কিন্তু কেউ জানে না আসলে এটি কি। লোকেরা একে নিয়ে গান গায়, কাব্য রচনা করে, অথচ তারা জানে না ভালোবাসা জিনিসটা কি।

আমার নিজস্ব পর্যবেক্ষণ এটা; যখন কোনো ব্যক্তি প্রেমের কাব্য রচনা করে, ভালোভাবেই জানে, সে একে ধরতে পারেনি। তার জানা নেই ভালোবাসা কি জিনিস। অন্যথায় কে যায় প্রেমের কাব্য রচনায়? যদি তুমি ভালোবাসতেই পারো, তবে তুমি কাব্য রচনা বাদ দিয়ে ভালোবাসায় তৎপর হতে।

আমি অনেক কবি দেখেছি, কিন্তু এমন কাউকে পাইনি যে ভালোবাসা কি তা জানে। শুধু সাধকরাই তা জানে। ভালোবাসার সাথে যা-কিছু সম্পর্কযুক্ত করা হয়, আসলে ভালোবাসার সাথে তাদের কোনো সম্পর্ক নেই। কিভাবে তোমরা এর অপব্যবহার করো! তোমরা বৃন্দাবন যাও আর দেখো যে লোকেরা গল্পে মশগুল, আর কেউ হয়তো বলছে, ‘আমি আইসক্রিম ভালোবাসি!’ কেউ-বা ক্যাডিলাক কার ভালোবাসে, আর কেউ ভালোবাসে তার কুকুর, কেউ-বা বিড়াল, আর কেউ তার স্ত্রীকে… আর লোকেরা যে কোনো কিছুর জন্য এই ‘ভালোবাসা’ শব্দটি ব্যবহার করছে।

ভালোবাসা কোনো অবজেক্ট জানে না, একে এড্ড্রেস করা যায় না। ভালোবাসা একমাত্র ঈশ্বরের সাথে সম্পর্কযুক্ত। যদি তুমি তোমার স্ত্রীকে সত্যিকারভাবে ভালোবাসো, তুমি দেখতে পাবে : স্ত্রী অদৃশ্য হয়ে গেছে এবং ঈশ্বর সেখানে দণ্ডায়মান। যদি তুমি বৃক্ষ ভালোবাসো, হঠাৎ তুমি দেখতে পাবে, বৃক্ষ অদৃশ্য আর ঈশ্বর সেখানে গাঢ় সবুজ, উদ্ভাসিত। ভালোবাসা ঈশ্বরের সাথে সম্পৃক্ত। ভালোবাসা কখনো আংশিক হয় না, ভালোবাসা সমগ্রের সাথে। ভালোবাসা প্রায় প্রার্থনার সমার্থক।

কিন্তু আমরা ভালোবাসাকে জানি না। আর ছেলেবেলা থেকেই আমাদের বিকৃত করা হয়েছে। মা তার শিশুকে বলেন, ‘আমাকে ভালোবাসো, আমি তোমার মা’—যেহেতু তুমি তার মা তাই তুমি তাকে ভালোবাসায় জোর করছো। বাবা বলেন, ‘আমাকে ভালোবাসো, আমি তোমার বাবা’—যেন ভালোবাসা একটা লজিক : ‘যেহেতু আমি তোমার বাবা, আমাকেই ভালোবাসতে হবে।’ আর শিশুটা বুঝতে পারে না, সে কি করবে। একটা

স্বীকারোক্তির মাধ্যমে কি করে ভালোবাসা হয়, যেহেতু সে তোমার বাবা? শিশুটা অপরাধবোধে ভুতে থাকে, যদি সে ভালোবাসা অনুভব না করে। তাই সে অভিনয় করে হলেও, ভালোবাসা দেখায়। ভালোবাসা কি তা না-বুঝলেও সে হাসে আর বলে, ‘মা, বাবা, আমি তোমাদের ভালোবাসি’, আর বাবা-মা খুশি হয়ে যান। লোকেরা ফাঁকা বুলিতে খুব খুশি হয়। মা খুব খুশি কারণ অবশেষে তাকে কেউ একজন ভালোবেসেছে; কমপক্ষে তার সন্তান তো তাকে ভালোবাসে। কেউ কখনো তাকে ভালোবাসেনি…

শিশুটা ধীরে ধীরে পলিটিশিয়ান বনতে থাকে : সে প্রতারণার কৌশলগুলো আয়ত্ব করতে থাকে। কিছুদিনের মধ্যে সে এতে পাকা হয়ে যায়। সে তার সারাজীবন কৃত্রিম ভালোবাসার উপর দিয়ে চালাতে অভ্যস্ত হয়ে যায়। সে তার স্ত্রীকে সারাদিনে শত বার বলবে, ‘আমি তোমাকে ভালোবাসি, আমি তোমাকে ভালোবাসি’, এগুলো হলো প্রাণহীন কথা। এর কোনো গভীরতা নেই, ফাঁকা বুলি। কিন্তু এগুলো কাজ করে, কারণ মানুষ কথায় বাঁচে। মানুষ সত্যিটা জানতে চায় না, সত্যের সাথে তারা পুরোপুরি সম্পর্কহীন।

ডেল কার্নেগি তার অনুসারীদের বলেন, যদি তুমি তোমার বউকে ভালো নাও বাসো, তবু দিনে তিন থেকে চার বার বলবে ‘আমি তোমাকে ভালোবাসি’, আর এই কথায় কাজ হয়। এই কথার কোনো মানে থাকুক আর নাই থাকুক বলে যাও; যেহেতু এতে কাজ হয়। মানুষ কথাকে আমল দেয়, সত্য তাদের কাছে মুখ্য নয়।

যখন একটা শিশু ভালোবাসার ভান করা শিখে যায়, তখন প্রকৃত ভালোবাসা জানা আর তার পক্ষে সম্ভব হয় না—কারণ ভালোবাসা এমন জিনিস না যা তুমি চাইলেই করতে পারো। এটা ঘটে; এতে তোমার কোনো হাত থাকে না। ভালোবাসা তোমার চেয়ে বড় কিছু, তোমার চেয়ে বিশাল। তুমি একে ম্যানেজ কিংবা ম্যানিপুলেট করতে সক্ষম নও। এই বিষয়টি স্মরণে রেখ এবং নিজের হৃদয়কে উম্মুক্ত রাখো। ভান করো না। যখন এটা আসে, কৃতজ্ঞতা অনুভব করো; যখন চলে যায়, অপেক্ষায় থাকো। কিন্তু ভান করতে যেও না।

যদি তুমি ভান না করো, একদিন দেখবে ভালোবাসার উদয় হয়েছে, ভালোবাসার ফুল ফুটেছে। আর যখন তোমার হৃদয়ে ভালোবাসার ফুল ফুটবে, এর সুগন্ধ ঈশ্বরের পদপ্রান্তে চলে যাবে। এটি যে কোনো পথে যেতে পারে : যেতে পারে তোমার সন্তানের মাধ্যমে, স্ত্রীর মাধ্যমে, স্বামীর মাধ্যমে, বন্ধুর মাধ্যমে, যেতে পারে একটি বৃক্ষ কিংবা পাহাড়ের মাধ্যমে। এটি যে কোনোভাবে যেতে পারে, যে কোনো মাধ্যমে—কিন্তু এটি ঈশ্বর পর্যন্ত পৌঁছুবেই।

ভালোবাসা সমগ্রকে নির্দেশ করে। এর জন্য অপেক্ষায় থাকো। আর ভালোবাসা হচ্ছে সকল তালা ও প্রতিবন্ধকতা খুলে দেবার গোপন চাবি। আর প্রতিবন্ধকতা আর কিছুই না, এটি তোমার সত্ত্বায় থাকা একটি তালা। ভালোবাসা গোপন চাবি; এটি সকল তালা খুলে দেয়।
মাস্টার কি…

(চলবে)

 

The path of love : Osho Rajneesh. প্রেমের সরল পথ (দি পাথ অব লাভ) : ওশো রজনীশ

ধারাবাহিকভাবে পড়তে বিষয়ে ক্লিক করুন

দি পাথ অব লাভ – ১
দি পাথ অব লাভ – ২
দি পাথ অব লাভ – ৩
দি পাথ অব লাভ – ৪
দি পাথ অব লাভ – ৫

পরবর্তী কিস্তি পর্যায়ক্রমে আসছে…

Share us

সম্পাদক

Jebunnahar Joni

জেবুননাহার জনি। Jebunnahar joni. কবি ও গল্পকার। জন্ম : ১১ জানুয়ারি, নারায়ণগঞ্জ; পৈতৃকনিবাস মাদারীপুর। পিতা : আতাউর রহমান হাওলাদার, মাতা : নুরুননাহার খান। সমাজকল্যাণে বিএ সম্মানসহ এমএ। পেশা : শিক্ষকতা। লেখার বিষয় : কবিতা ও গল্প। প্রকাশিত গ্রন্থ : মেঘলা রাতে চাঁদ (গল্প, ২০০৭), বিরান পথের কাশবন (কবিতা, ২০১৭)। পুরস্কার : গাংচিল সাহিত্য পুরস্কার (২০১১), সমধারা সাহিত্য পুরস্কার (২০১৫)।